সেনা ছায়ায় জয়ী হতে মরিয়া ইমরান, নওয়াজের দলে ভয় আতঙ্ক গ্রেফতার

আন্তর্জাতিক

নিউজ মিডিয়া ২৪:ডেস্ক: পাকিস্তানের মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদসহ সবাই অভিযোগ করে আসছেন, বুধবার দেশটির নির্বাচনের ফল ইমরান খানের অনুকূলে নিতে চেষ্টা করছে সেনাবাহিনী। এতে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া মসৃণ হচ্ছে না বলেই ধরে নেয়া হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে ক্রিকেটার থেকে রাজনৈতিক বনে যাওয়া ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পার্টির সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মুসলিম লীগ-নওয়াজের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সামরিক বাহিনীর পছন্দের প্রার্থী ইমরান খান নিজেকে দুর্নীতিবিরোধী যোদ্ধা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি ও স্বজনপ্রীতির সমালোচনা করে যাচ্ছেন তার নির্বাচনী প্রচার অভিযানে। দেশের সুরক্ষার জন্যই সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক রাখলেও কোনো সহায়তা নিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইমরান খান বলেন, যখন আপনার কোনো নৈতিক অবস্থান থাকবে না, নেতৃত্বের গুণাবলীও দুর্বল হয়ে পড়বে, তখন আপনি এমনিতেই নাই হয়ে যাবেন। অন্য কেউ এসে সেই জায়গা পূরণ করবে।
৩৫ বছরের কম বয়সী পাকিস্তানিদের মধ্যে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বেশি, যা মোট ভোটারের ৪৩ শতাংশ। তারা মূলত বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে উৎসুক হয়ে আছে। এ ছাড়া দেশটির আদালতের ওপর সামরিক প্রভাব ও গণমাধ্যমের লাগাম টেনে ধরার পুরো সুবিধাটা ইমরান খানের ঘরে যাচ্ছে।
১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর পারমাণবিক অস্ত্রসমৃদ্ধ দেশটির অধিকাংশ সময় ক্ষমতায় ছিল সামরিক বাহিনী। এমনকি বেসামরিক সরকারের শাসনেও তাদের হাতে ব্যাপক ক্ষমতা ছিল। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতি নির্ধারণ, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহনশীলতার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর ভূমিকাই বেশি।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষানীতিতে সেনাবাহিনীর নাক গলানো বন্ধ করতে চেয়েছিলেন নওয়াজ শরিফ। চিরশত্রু প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গেও তিনি সম্পর্কোন্নয়ন চেয়েছিলেন। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোরও বিরোধিতায় নেমেছিলেন তিনি।
ওয়াশিংটন ডিসির উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে কারাবন্দি নওয়াজ শরিফের সম্পর্কে গত কয়েক দশক ধরেই টানাপড়েন চলছে। কাজেই প্রভাবশালী সেনাবাহিনী কোনোভাবেই চাচ্ছে না, পিএমএল-নওয়াজ ফের ক্ষমতায় আসুক।
তিনি বলেন, তারা নেপথ্যে থেকে পিএমএল-নওয়াজের জয়ের সম্ভাবনা নাই করে দিতে ব্যাপকমাত্রায় কারসাজিতে মেতে উঠেছে।
দলটির সদস্যরা আগে থেকে অভিযোগ করছেন, তাদের কর্মীদের হয়রানি ও গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে। জ্যেষ্ঠ নেতারা বলেন, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে পিএমএল-নওয়াজ ছেড়ে ইমরান খানের দলে যোগ দিতে বলা হচ্ছে তাদের। সে অনুযায়ী কাজ না করলে পস্তাতে হবে বলে সেনা গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা তাদের একের পর এক হুমকি-ধমকি দিয়ে যাচ্ছেন।

নওয়াজের দলের সতেরো হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার বিচার চলছে। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত অব্যাহত রাখা হয়েছে।
শুধু পিএমএল-নওয়াজের দলই নয়, সেনাবাহিনীর চাপ থেকে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও রেহাই পাচ্ছেন না। পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতাকর্মীদেরও আনুগত্য পরিবর্তনে জোর-জবরদস্তি চলছে।
দেশটির প্রচার সংখ্যায় শীর্ষ ইংরেজি দৈনিক ডনের বিতরণে বাধা দেয়া হচ্ছে। পিএমএল-নওয়াজের প্রতি সহানুভূতির কারণেই পত্রিকাটির প্রচার কমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে সেনাবাহিনী।
অনেক সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট অভিযোগ করেন, পিটিআইয়ের হয়ে কাজ করতে তাদের জোর করা হচ্ছে। নওয়াজ শরিফের দলের প্রচার ও সেনাবাহিনীর সমালোচনা করা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে তাদের।
দেশটির ইতিহাসের অর্ধেকটা সময়ই শাসন করেছে সেনাবাহিনী। কিন্তু সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা অভিযোগ করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নির্লজ্জভাবে হানা দিচ্ছে সেনাবাহিনী।
সাংবাদিক ও লেখক আহমাদ রশীদ বলেন, সত্যিই এটা ভয়ঙ্কর নোংরা হস্তক্ষেপ। সবচেয়ে স্থূল কারচুপির নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ।
তিনি বলেন, বড় বড় রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার গোষ্ঠী, সুশীল সমাজ ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে নির্বাচনে এই নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ নিয়ে ব্যাপক আপত্তি উঠেছে। ইতিহাসে সবচেয়ে শঠতায়পূর্ণ ভোট হতে যাচ্ছে এবার বলে মনে করেন রশীদ।
২০১৬ সালের পানামা পেপারস ফাঁসের ঘটনায় দুর্নীতির অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছে নওয়াজ শরিফকে। এতে দেখানো হয়েছে, বেনামি অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে তিনি লন্ডনে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন।
বিচার প্রক্রিয়াকে নওয়াজ শরিফ ও তার পরিবার ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সেনা হস্তক্ষেপের কারণেই কারাগারে যেতে হয়েছে তাকে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। যদিও দেশটির শক্তিশালী সেনাবাহিনী সে অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।
সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা বা আইএসআই বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ, নওয়াজ শরিফ ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে রায় দিতে চাপ দিয়েছে বলে শনিবার ইসলামাবাদের একজন বিচারক অভিযোগ করেছেন।
রাওয়ালপিন্ডির বার অ্যাসোসিয়েশনে আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তৃতায় বিচারক শাখাওয়াত আজিজ সিদ্দিকী এ অভিযোগ করেন।
পাক রাজনীতিতে সেনা হস্তক্ষেপের সর্বশেষ অভিযোগ হচ্ছে- বিচারক শাখাওয়াতের এই বক্তৃতা। তবে তার আলোচনায় আইএসআইয়ের সমালোচনার অংশটুকু স্থানীয় কোনো টেলিভিশন সম্প্রচার করেনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তার বক্তৃতার ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
গত ১৭ জুলাই ইসলামাবাদ হাইকোর্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে নওয়াজ শরিফের আবেদনের শুনানি স্থগিত রাখে। কাজেই নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তাকে কারাগারেই থাকতে হচ্ছে।
দুর্নীতিবিরোধী আদালতের দেয়া কারাদণ্ডের রায় মোকাবেলা করতে গত ১৩ জুলাই নওয়াজ শরিফ ও তার মেয়ে মরিয়ম লন্ডন থেকে পাকিস্তানে যান। তাদের প্রত্যাবর্তন ঘিরে বহু নাটক হয়েছে। নওয়াজকে স্বাগত জানাতে লাহোর বিমানবন্দরে যেতে চাইলে ও মিছিলের অংশ নেয়া নওয়াজ সমর্থকদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণাৎ ধরপাকড়ে নামে তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক ওমর ওয়ারিয়াচ বলেন, নওয়াজের ফিরে আসার আগের দিন নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগে অন্তত ৬০০ কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। কেবল নওয়াজ শরিফকে সমর্থন করায় কয়েকশ পাকিস্তানিকে বিনাবিচারে আটক করা হয়েছে। একসময়ের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবন্ত রাজনৈতিক পরিবেশ আজ শ্বাসরুদ্ধকর ও ছোট হয়ে গেছে।
পিএমএল-এন নেতা শহীদ খাকান আব্বাসী বলেন, তার সরকার যখন ক্ষমতায়, তখন থেকেই নির্বাচনে কারসাজির পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। মাস তিনেক আগে দলীয় এক বৈঠকে উপস্থিতদের অর্ধেক দাবি করেন, সেনাবাহিনীর লোকজন তাদের দল ছেড়ে দিতে চাপ দিয়েছে।
গত জুলাইয়ে নওয়াজ শরিফ ক্ষমতাচ্যুত হলে শহীদ খাকান আব্বাসীই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

গত মাসে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় পিএমএল-এন প্রার্থী রানা আব্বাস বলেন, নওয়াজ শরিফের ওপর থেকে তার সমর্থন উঠিয়ে নিতে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন তাকে নির্যাতন ও হুমকি দিয়েছে।
তিনি বলেন, অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকজন ফোন দিয়ে তাকে দল ছাড়তে বলেছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ডেকে নিয়েও একই বার্তা দিয়েছে।
গত মাসে সেনাবাহিনীর নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হানা দেয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, এ সময়ে তারা আমার কর্মীদের মারধর করে। মূলত অর্থনৈতিকভাবে আমাকে শেষ করে দিতেই আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করেছে তারা।
এর পর থেকে আর কোনো বিবৃতি দিতে অস্বীকার করছেন তিনি।
জুনে দেশটির সেনাবাহিনী বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম, সামাজিক নেটওয়ার্ক ও মূল ধারার রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এতে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি ও হুমকি দেয়া হয়েছে। বেসামরিক সরকারের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন গণমাধ্যমে বন্ধ করে দিয়েছে সেনাবাহিনী।
গত মে-তে পাঞ্জাবপ্রদেশের অন্তত ২১ পিএমএল নেতা আনুষ্ঠানিকভাবে ইমরান খানের পিটিআইতে যোগ দেন। নির্বাচনের আগে পিটিআইয়ের এটিই সবচেয়ে শক্তিবৃদ্ধির ঘটনা।
চলতি মাসের শুরুতে ১১ জনের বেশি প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে জিপ গাড়ি প্রতীকের বদলে পিমিএল-এন টিকিটে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর চাপে একটা বড়সংখ্যক রাজনীতিবিদ পিএমএল-এন ছেড়ে জিপ গাড়ি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছিলেন।
অন্যান্য পিএমএল-এন নেতার মতো আব্বাসীর নিজের মনোনয়নপত্রও প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। উচ্চ আদালতের নির্দেশনার আগে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে।

আব্বাসী বলেন, আরও অনেককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে এ রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাদের কারও বিরুদ্ধে হঠাৎ করেই দুর্নীতির মামলা চালু করা হয়েছে। কারও কারও মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনার প্রত্যাখ্যান করেছে।
তিনি বলেন, এটি সত্যিই আমাদের দলের বিরুদ্ধে পাশবিক ও অদ্ভুত নির্যাতন।
সম্প্রতি কিছু ধর্মভিত্তিক দলও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। তাদের মধ্যে একটি নিষিদ্ধ দলের প্রধানও রয়েছেন। দেশটিতে শিয়া সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কিন্তু অতীতের সহিংস রূপ থেকে সরে এসে তাদের মূলধারায় চলে আসার সুযোগ দিয়েছে সেনাবাহিনী। তার নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছেন। মূলত পিএমএল-এনের ভিত্তি দুর্বল করতে সেনাবাহিনী তাদের ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, কারচুপির কারণে ঝুলন্ত পার্লামেন্ট কিংবা একটি দুর্বল জোট সরকার গঠনের দিকে যেতে বাধ্য হতে পারে পাকিস্তান।
কুগেলম্যান বলেন, সেনাবাহিনী মূলত এমন একটি শাসনব্যবস্থাই চাচ্ছে। শক্তিশালী ম্যান্টেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা ঐক্যবদ্ধ সরকারকে তারা নিজের মতো করে ব্যবহার করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে একটি দুর্বল ও বিভক্ত সরকার তাদের জন্য বেশি সুবিধাজনক হবে।
নির্বাচন কমিশন পোলিং স্টেশনগুলোতে তিন লাখ ৭১ হাজার সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ এই সংখ্যা ২০১৩ সালের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি।
সবচেয়ে ভয়ের কথা হচ্ছে, এসব সেনা সদস্যকে ব্যাপক বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হচ্ছে। এ সময়ে তারা যে কাউকে বিচারের মুখোমুখি করতে পারবে। নির্বাচনী আইন লঙ্ঘন করলে তাৎক্ষণিক কারাদণ্ডের শাস্তিও দিতে পারবে।
অতীতের কয়েকটি সরকারের শীর্ষ পদে ছিল এমন একটি সেনাবাহিনীর ক্ষমতা বাড়ানো পাকিস্তানের বিকাশমান গণতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
কুগেলম্যানের মতে, ক্ষতি যা হওয়ার তা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। গত কয়েক মাসে দেশটির সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ভারসাম্যহীনতা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।
তিনি বলেন, এতে পাকিস্তানের বেসামরিক প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্বের ক্ষমতা শক্তিশালী করার চেষ্টা মারাত্মক প্রতিকূলতায় হাবুডুবু খাচ্ছে। কাজেই বাড়িয়ে না বললেও এই চেষ্টা এখন অযৌক্তিক আবদারে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ দৈনিক অবজারভার যোগাযোগ করলে কোনো সাড়া পায়নি। গত মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল আসিফ গাফুর নির্বাচনের হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
পিটিআই দলের মুখপাত্র ফাওয়াদ গাফুর নির্বাচনে কারচুপির চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দলকে সেনাবাহিনী সমর্থন দিচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, তাও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
ফাওয়াদ গাফুর বলেন, যদি নওয়াজের দলের জনপ্রিয়তা থাকত, তা হলে একজন কর্নেল কিংবা মেজরের রোষানলে পড়লেও কেউ তাদের জয় ঠেকাতে পারত না।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী কয়েকজন লোকের ওপর জবরদস্তি করতে পারে। তাই বলে ২০ কোট ৮০ লাখ লোককে ইমরান খানের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করতে পারে না। যদি এমনটি বলা হয়, তবে তা একটা কৌতুক ছাড়া আর কিছু না।
দেশটির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি বলেন, এই নির্বাচনে পাকিস্তানের ভাগ্য সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে।
হিনা পাকিস্তান পিপলস পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, রাজনৈতিক পছন্দের কারণে আমিও নওয়াজ শরিফকে ঘৃণা করি। কিন্তু এই ব্যবস্থার নিজস্ব সংশোধনের একটা সুযোগ থাকা দরকার। বাইরের কোনো শক্তিকে সংশোধনের অনুমতি দিতে পারি না বলে জানান তিনি।
হিনা রাব্বানি বলেন, একটা জিনিসই এ ব্যবস্থাকে সংশোধন করতে পারে, যা হচ্ছে নির্বাচন। ২০১৩ সালের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সে সময়ে একটি বেসামরিক সরকার থেকে আরেকটি ক্ষমতা গ্রহণ করেছে। কিন্তু পরবর্তী ১০ বছরের নির্বাচনে আমাদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা অপেক্ষা করছে।
লাহোরভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা দা ডেইলি টাইমসের সম্পাদক রাজা রুমি বলেন, সামরিক বাহিনী নিজের জন্য এমন একটা সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি করে নিয়েছে, যেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। তারা একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্ট চাচ্ছে, যেটা বিপুল সামরিক বাজেট কর্তন কিংবা তাদের পররাষ্ট্রনীতি কাটছাঁট করতে পারবে না।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনী এমন একটা সরকার চায়, যারা সড়ক পরিষ্কার করবে ও গাছ রোপণ করবে। এর বাইরের কিছু নয়।
তবে দেশটিতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, আগামীতে তাদের অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ, প্রতিবেশী ভারত ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, একসময়ের মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তলানিতে যাওয়া সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও দূর করতে হবে নতুন সরকারকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *