১১ মাসে ক্ষমতাসীনরা সংখ্যালঘুদের ওপর ১৭৯২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে: হিন্দু মহাজোট

জাতীয়

নিউজ মিডিয়া ২৪:ঢাকা : চলতি ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ৩৩০ দিনে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সরকার দলীয় নেতা কর্মীসহ অন্যান্য সংগঠনের নেতাকর্মী সমর্থকদের দ্বারা হামলা লুটপাট, অগ্নি সংযোগসহ ১৭৯২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনার সাথে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদের অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার সংখ্যা কমপক্ষে ৫০,০০০(পঞ্চাশ হাজারটি) এবং ২৭৩৪.৮১ একর ভূমি জবর দখল হয়েছে। এর মধ্যে হত্যার শিকার হয়েছে ৮৮ জন, হত্যার হুমকি ২৮৭ জনের ওপর, হত্যা চেষ্টা ৬৮ জনের ওপর, জখম ও আহত করা হয়েছে ৩৪৭ জনকে, নিখোঁজ হয়েছে ৪৮ জন, চাঁদাবাজী, মারধর, আটক রেখে নির্যাতন হয়েছে ১১১ ঘটনা, চাঁদাবাজী হয়েছে ৪০ লাখ টাকা, পরিবার ও মন্দির লুট এর ৯২ টি ঘটনা ঘটেছে। বসতবাড়ী ও সম্পত্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ৪৪টি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ৩৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, ২৭৩৪.৮১ একর সম্পত্তি দখল হয়েছে।
আজ (৩০ নভেম্বর) সকাল ১১টায় বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের উদ্যোগে ২০১৮ সালে হিন্দু নির্যাতনের রিপোর্ট প্রকাশ ও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বচনে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভূমিকা বিষয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতারা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত ১১ মাসে প্রায় ৯ কোটি টাকার ভূমি বে-দখল হয়। ঘরবাড়ি দখলের ঘটনা ঘটেছে ৭টি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ৩ টি, দখলের চেষ্টা ২৭১.৩ একর, বসত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ ২১৭টি পরিবার, উচ্ছেদের চেষ্টা ৯০৬৩টি পরিবার, উচ্ছেদের হুমকি ২৯০ পরিবার, দেশ ত্যাগের হুমকির শিকার ২২৩ পরিবার, নিরাপত্তাহীনতায় ১৫১০ পরিবার, মন্দিরে হামলা ভাংচুর অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১৩১টি, বাড়িতে হামলা ভাংচুর অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটেছে ১০৮টি, প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে ৩৭৯টি, প্রতিমা চুরি হয়েছে ৯টি, ২৯ জনকে অপহরণ করা হয়েছে, ২৯ জনকে ধর্ষণ করা হয়েছে, ২১ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে, ৯ জনকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। ৪ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা, ২৪ জনকে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত ও ধর্মান্তর করণের চেষ্টা হয়েছে। ৭টি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এর ঘটনা ঘটেছে। মিথ্যা মামলায় আসামি গ্রেফতার বরখাস্ত করা হয়েছে ১৮ জনকে, ১১০ টি পরিবারকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অপবিত্রকরণ ৩টি, পরিকল্পিতভাবে (হিন্দু) ধর্মীয় নিষিদ্ধ গোমাংস খাওয়ানোর ৫টি ঘটনায় ৭৩৯ জনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তাগণ আরও বলেন, ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতন ঘটনা বিশ্বব্যাপী প্রচার করে বর্তমানে ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিকভাবে সুবিধা লাভ করেছে। অথচ ১০ বছর দেশ পরিচালনা করলেও কোন ঘটনার বিচার হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট এর মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত মোট ৩৩০ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সরকার দলীয় নেতা কর্মী সহ অন্যান্য সংগঠনের নেতা কর্মী সমর্থকদের দ্বারা হামলা লুটপাট সহ নানা ঘটনা ঘটেছে। অনেক ঘটনার সাথে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদের অভিযোগও রয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জারে প্রকাশিত এবং হিন্দু মহাজোটের জেলা, থানা নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ১৭৯২টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ব্যক্তি, পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যার সংখ্যা কমপক্ষে ৫০,০০০(পঞ্চাশ হাজারটি) এবং ২৭৩৪.৮১ একর ভূমি জবর দখল হয়েছে।
অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক বলেন, হিন্দু মহাজোট একটি অরাজনৈতিক সামাজিক ধর্মীয় সংগঠন। হিন্দু মহাজোট একদিকে যেমন কোন রাজনৈতিক দলের লেজুরবৃত্তি করে না; অপরদিকে কোন রাজনৈতিক, সামাজিক ধর্মীয় সংগঠন বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধাচরণও করে না। হিন্দু মহাজোট সকল মত ও পথের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। হিন্দু মহাজোট প্রধানমন্ত্রী সহ আওয়ামীলীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতৃবৃন্দের সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি দাওয়া নিয়ে আলোচনা করেছে। বিএনপি ও জাতীয় পার্টি হিন্দু সম্প্রদায়ের দাবি-দাওয়ার প্রতি একাত্মকতা প্রকাশ করলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল থেকে হিন্দু সম্প্রদায় কোন আশাব্যাঞ্জক প্রতিশ্রুতি পায় নাই।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে যে হারে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ চলছে তাতে হিন্দু সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। এদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বৃটিশ পার্লামেন্টে এবং আমেরিকার কংগ্রেসে শুনানি এবং প্রস্তাব পাশ হলেও লজ্জার বিষয় এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাদেরকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠায়; তারা আজ পর্যন্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন নিপিড়নের বিষয় নিয়ে সংসদে কোন ভূমিকা রাখে নাই। সরকার হিন্দু সম্প্রদায়ের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় কোন কার্যকর ভূমিকা রাখেন নাই।

‘একটি স্বাধীন সংখ্যালঘু কমিশন গঠন করতে হবে এবং ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত সকল সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার তদন্ত পূর্বক বিচার করতে হবে,’ উল্লেখ করে সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে বেশ কিছু দাবি-দাওয়া জানানো হয়।
বলা হয়, আমরা সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তেহারে উক্ত দাবি সমূহ বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট ঘোষণা আশা করছি। যে দল বা জোট উক্ত দাবি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে লিখিত আকারে তাদের নির্বাচনী ইস্তেহারে অঙ্গীকার করবে; হিন্দু সম্প্রদায় সেই দল বা জোটকে ভোট দেবে। অন্যথায় হিন্দু সম্প্রদায় ভোট বর্জনের কর্মসূচী ঘোষণা করবে।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- হিন্দু মহাজোটের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডঃ দীনবন্ধু রায়, সিনিয়র সহ সভাপতি ডঃ সোনালী দাস, ডাঃ মৃত্যুঞ্জয় রায়, অ্যাডঃ বি. বি. গোস্বামী, প্রদীপ চন্দ্র পাল, মিঠু রঞ্জন দেব, প্রধান সমন্বয়কারী বিজয় ভট্টাচার্য, সমন্বয়কারী অ্যাডঃ তারক চন্দ্র রায়, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব উত্তম দাস, যুগ্ম মহাসচিব মণিশঙ্কর মন্ডল, সঞ্জয় ফলিয়া, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডঃ প্রতীভা বাকচী, আর্ন্তজাতিক সম্পাদক রিপন দে, যুব বিষয়ক সম্পাদক সমিরন বড়াল, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক প্রভাষক সুমন সরকার, সাগরিকা মন্ডল, বিজন সানা, সুশীল মিত্র, হিন্দু যুব মহাজোট এর সভাপতি কিশোর কুমার বর্মন, প্রধান সমন্বয়কারী সন্তোষ মাহাতো, আর্ন্তজাতিক বিষয়ক সম্পাদক ডাঃ সমিত রায়, প্রবীর সরদার, সুমন দাস, হিন্দু ছাত্র মহাজোটের যুগ্ম আহ্বায়ক প্রশান্ত কুমার হালদার, যুগ্ম আহ্বায়ক সাজেন কৃষ্ণ বল, সদস্য সচিব হরেকৃষ্ণ বারুরী, জীবন কুমার রায় ও সদস্য সচিব হরেকৃষ্ণ বারুরী প্রমুখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *